আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ—একজন বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। সংগঠক, বক্তা, উপস্থাপক, পরিবেশ-সচেতন কর্মী—বহু পরিচয়ের ভিড়ে তার লেখকসত্তা তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। অথচ তার স্মৃতিকথাগুলোতে ফুটে উঠেছে এক অনন্য জীবনবোধ, সময়ের গভীর পর্যবেক্ষণ এবং সমাজ-বাস্তবতার সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ।
তার রচিত স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ ‘ভালোবাসার সাম্পান’ শুধু একটি বই নয়, বরং সময়ের দর্পণ। এতে তিনি তুলে ধরেছেন ষাটের দশকের সাহিত্য-সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। এই সময়টি বাঙালির ইতিহাস ও সাহিত্য উভয় ক্ষেত্রেই ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ—যেখানে একদল তরুণ লেখক স্বপ্ন ও সাহসকে পুঁজি করে নতুন ধারার সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন।
এই বইয়ের কেন্দ্রে রয়েছে ‘কণ্ঠস্বর’ নামের একটি সাহিত্যপত্রিকা, যা ছিল কেবল একটি প্রকাশনা নয়, বরং একটি আন্দোলন। সীমিত সামর্থ্য, অভাব-অনটন এবং অনিশ্চয়তার মধ্যেও একদল উদ্যমী তরুণ নিজেদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরেছিল এই পত্রিকার মাধ্যমে।
গ্রন্থের শুরুতেই মহাদেব সাহা–এর আবেগঘন পঙক্তি পাঠককে সেই সময়ের আবহে নিয়ে যায়। লেখকের ভাষায়, তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, সাহস এবং স্বপ্ন মিলেমিশে এক উন্মাতাল সময়ের জন্ম দিয়েছিল—যা এই বইয়ের প্রতিটি পাতায় প্রতিফলিত হয়েছে।
লেখক তুলে ধরেছেন, কীভাবে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি ছাড়াই, শুধু মনোবল আর সৃষ্টিশীলতায় ভর করে ‘কণ্ঠস্বর’ হয়ে উঠেছিল সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যপত্র। তার ভাষায়, এই পত্রিকা ছিল আপসহীনতা, দুঃসাহস ও বিদ্রোহের প্রতীক।
মানুষকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের। সেই দক্ষতায় তিনি সমকালীন সাহিত্যিকদের এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যা পাঠককে তাদের নতুন করে চিনতে সাহায্য করে। যেমন নির্মলেন্দু গুণ–কে তিনি দেখিয়েছেন এক স্বতন্ত্র, অকপট ও দুঃসাহসী ব্যক্তিত্ব হিসেবে।
বইটিতে শুধু সাহিত্যচর্চার গল্প নয়, বরং সেই সময়ের মানুষের জীবন, সংগ্রাম, বন্ধুত্ব এবং সৃষ্টিশীলতার এক সম্মিলিত চিত্র ফুটে উঠেছে। পত্রিকার প্রচ্ছদ, লেখালেখি, পাঠকের প্রতিক্রিয়া—সবকিছু মিলিয়ে এটি হয়ে উঠেছে এক সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা।
তবে বইয়ের শেষাংশে এসে কিছুটা অপূর্ণতার অনুভূতি থেকে যায়। বিশেষ করে ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে আরও বিস্তারিত জানতে আগ্রহ জাগে পাঠকের মনে।
গ্রন্থের শেষে মুনীর চৌধুরী–এর মন্তব্য সংযোজন করা হয়েছে, যেখানে তিনি ‘কণ্ঠস্বর’-এর সাহিত্যিক গুরুত্ব তুলে ধরে এটিকে সময়ের প্রচলিত সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতিবাদ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সব মিলিয়ে, ‘ভালোবাসার সাম্পান’ শুধু একটি স্মৃতিকথা নয়—এটি স্বপ্ন, সাহস, বন্ধুত্ব এবং নতুন সাহিত্যধারার এক অনন্য উদযাপন।
